ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে রবির মনে হলো, আজ সে অফিস যাবে না। সুমনদা যা ভাবার ভাবুক, যে যা মনে করার করুক; আজ রবিবার। অলস হওয়ার দিন। মাথার পাশের টেবিল থেকে ফোনটা হাতে তুলে নিলো সে। একটু YouTube-এ wrestling দেখা যাক। কেউ জানে না, ২৫ বছরের রবি এখনও নিয়মিত WWE দেখে। কিছু ব্যক্তিগত বিষয় সেরকম থাকাই ভালো।
কিন্তু ফোনটা হাতে নিতেই তড়াক করে বেজে উঠলো! সুমনদা! উফফ, জ্বালাতন!
-হ্যাঁ, বলো সুমনদা।
- এই উঠলে নাকি?
- না, এই উঠছিলাম।
- কাল রাতে অঙ্কটা মিলেছে, বুঝলে?
- ও, তাই?
- হ্যাঁ, ১০টা নাগাদ এসো অফিসে। Discuss করা যাক।
- ঠিক আছে।
ফোন কেটে রবি দেখলো, তখন ঘড়িতে ৯টা বাজে। রেসিডেন্সিয়াল ক্যাম্পাসের মধ্যেই অফিস। তাড়াতাড়ি তৈরী হয়ে ব্রেকফাস্ট খেয়ে অফিসে পৌঁছলো রবি।
সুমনদার ঘরের দরজা নাড়তেই ভেতর থেকে আওয়াজ আসলো, 'চলে এসো'।
ঘরে ঢুকে দেখলো, দরজার দিকে পিঠ দেখিয়ে সাদা বোর্ডের সামনে সুমনদা দাঁড়িয়ে আছে। ৩৫ বছরের যুবক, উচ্চতায় ৬-ফিট, মাথায় কুচকুচে কালো চুলের মাঝে এক দুটো সাদার ওপর রোদের ঝলকানি দেখা যাচ্ছে; পড়নে আকাশী রঙের পাঞ্জাবি; দু' হাত পেছনে রাখা - বাঁ হাতের মধ্যে ডান হাত, তার মধ্যে বোর্ডের মার্কার। রবিবার সকাল ১০টায়, যখন পৃথিবীর সব মানুষ মাছ-মাংস কিনতে ব্যাস্ত, তখন এই মহামানব নিজের করা অঙ্কের দিকে তাকিয়ে কী না কী উদ্ধার করতে চলেছে! আর যেন কেউ বিজ্ঞানী হয় না!
- আমরা একটা ভুল করছিলাম। টোটাল ফ্রিকশন টাইম-এর সাথে বারছে। আমরা একটা অংশ যোগ করিনি আগের ক্যালকুলেশনে।
বোর্ডের দিকে তাকিয়েই সুমনদা বলে চলেছে। দেখেওনি কে ঢুকেছে ঘরে।
রবি এবার বললো, 'এবার সব মিলছে?'
-হ্যাঁ, নিজে একবার করে দেখো তো এখন।
এই বলে মানুষটা ঘুরলো দরজার দিকে। উজ্জ্বল মুখে কোথায় যেন আনন্দ মেখে আছে।
- বুঝলে রবি, এই ভুলগুলো তোমায় ধরতে হবে।
মাথা নিচু করে রবি কিছু বললো না। সুমনদা চেয়ার টেনে বসলো।
- তোমার PhD, রবীন্দ্র। এই স্টেপ গুলো তোমাকেই তো solve করতে হবে।
মৃদু স্বরে রবি বললো, "আমি বুঝতে পারিনি যে একটা অংশ বাদ পড়ে গেছে। মনে হচ্ছিলো সব মিলছে, কিন্তু বুঝতে পারছিলাম না কোথায় গন্ডগোল করছিলাম।"
- হুম, সে বুঝলাম। যাও একবার দেখো আমার ক্যাল্কুলেশন ঠিক আছে কিনা।
সুমনদার অফিস থেকে বেরিয়ে নিজের অফিসে এলো রবি। অন্য কোনো ছাত্র আজ আসেনি। কেনই বা আসবে? সেই বা কেন এসেছে? আজ ভেবেছিলো কাজ করবে না, নিজের মতো ঘুরবে, সিনেমা দেখবে। কিচ্ছু হলো না। এখন সেই এক-ই অঙ্ক আবার করতে হবে। খাতা খুলে তাড়াতাড়িই সে করে ফেললো অঙ্কটা। হ্যাঁ, সুমনদা ঠিকই বলেছে। তাকে জানিয়ে আসা যাক বরং যে অঙ্কটা এখন দুজনেই মেলাতে পারছে।
আবার দরজায় টোকা দিতে গিয়ে দেখলো দরজার দিকে তাকিয়েই সুমনদা বসে আছে। রবি ঘরে ঢুকে জানালো যে এখন তারও অঙ্ক মিলে গেছে। তাকে ইঙ্গিত করে সামনের চেয়ারে বসতে বললো সুমনদা।
- সামনের মাসে কানপুরে একটা কনফারেন্স আছে লিভিং ম্যাটারের ওপর।
- হ্যাঁ, আমি দেখেছিলাম ওদের ওয়েবসাইটে।
- Good! Apply করে দাও আজ সন্ধ্যের মধ্যে। একটা সেমিনার দিয়ে এসো।
- কিসের ওপর?
- এই যে তুমি নতুন রেজাল্ট পেলে - তার ওপর!
- কিন্তু এ তো একদম নতুন। আরেকটু deeply দেখতে হবে তো।
- হ্যাঁ, হবে বৈকি! এখনো এক মাস আছে।
- কিন্তু ওখানে তো সব বড় বড় মানুষরা আসবে। সেখানে আমি সেমিনার দেবো? কেউ শুনবে?
কিছুক্ষন চুপ করে থেকে একটু হেসে সুমনদা বললো, 'ওটাই তো তোমার কাজ। ব্যাস্ত মানুষদের থেকে তাদের মহামূল্যবান সম্পদ ধার নেওয়া।'
- কি সম্পদ? বুঝলাম না।
- মানুষের একটাই সম্পদ। সময়। মানুষের স্বার্থকতাই হলো অন্যের সময়ের কিছু অংশে নিজের স্বাক্ষর রেখে যাওয়া।
কি যে বলে না এই লোকটা! রবি জিজ্ঞেস করলো -
- তুমি যাচ্ছো না?
- না। তুমি যাও। লোকের তোমাকে চেনা দরকার। রবিবার দুপুরে আর কতজন মাংসের টান ছেড়ে অঙ্ক মেলাতে বসে?
মাথা নিচু করে রবি হালকা হাসলো। সুমনদা বললো -
- টিকিট কেটে নাও কনফারেন্সে apply করার পরেই। তবে সন্ধ্যে বেলায় কোরো এসব। এখন যাও, খেয়ে নাও। তারপর পারলে Nexus মলে গিয়ে নতুন মালায়ালী সিনেমাটা দেখে এসো। Chatha Pacha: The Ring of Rowdies. আমরা কাল নাইট শো গিয়েছিলাম। অপূর্ব! Pro-Wrestling কত বড় আর্ট, আর তার কি প্রভাব থাকে মানুষের ওপর... যাই হোক; এসো এখন।
অফিস থেকে বেরিয়ে রবি বুঝে পেলো না কি ভাববে সুমনদার বিষয়ে!
No comments:
Post a Comment