শুভ্রাকে ট্রেনে তুলে দিয়ে মনটা বেশ উদাস ছিল অভীকের। হতে পারে দু' দিনের জন্য আলাদা থাকা; কিন্ত এক বছর তারা এক সাথে আছে। নব দম্পতি।
উদাস হলেও একটা ফুরফুরে মেজাজ আছে অভীকের। বাইরে ড্রাইভার সহ ভাড়া করা গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। ইচ্ছে মত আজ ও যেকোনো জায়গায় দাঁড়াতে পারে, যেমন ইচ্ছে খেতে পারে; কোনো তাড়া নেই। মালদহ স্টেশন থেকে বেরিয়েই দেখতে পেলো কুশল গাড়িতে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অভীক কাছে আসতেই কুশল ড্রাইভারের দরজা খুলতে ব্যাস্ত হলো। তারপর অভীককে সামনের দরজা খুলতে দেখে একটু অবাক হয়েই বললো, ' সামনে বসবে নাকি ?'
অভীক একটু হেসে বললো, ' হ্যাঁ, যাতে কেউই না ঘুমাই '।
গাড়িতে ঢোকার সময় কুশল অভীকের সিটটা পেছনে ঠেলে দিলো, যাতে লম্বা মানুষটার পা রাখতে কোনো অসুবিধা না হয়। সিটে বসে বেল্ট বেঁধে নিয়েই অভীক বললো, গাজলের কোনো ভালো ধাবায় দাঁড়িয়ে একটু ব্রেকফাস্ট করে নেবো, ঠিক আছে? সেই ভোর বেলা থেকে না খেয়ে চলছে। কুশল মাথা নেড়ে সম্মতি দিল, মনে মনে নিশ্চই খুশি হয়েও।
মালদহ থেকে গাজল মিনিট কুড়ির পথ। রাস্তার ধারেই মা লক্ষ্মী হোটেল। বেশ কিছু সিঁড়ি দিয়ে উঁচু করে রাখা হোটেল এ ঢোকার পথ। গাড়ি পার্ক করে দুজনে সেই সিঁড়ি ধরে উঠে পড়ল জনমানবহীন - চেয়ার - টেবিলে ঢাকা মা লক্ষী হোটেলে। কুশল হাঁক দিলো, ' খাবার আছে কি?' বেশ কিছুটা দূরে দুজন মধ্য বয়স্ক মানুষকে একটি ঘরে দেখা গেলো। তারা কি যেন বললো। অভীক বুঝল না। কুশল আবার একই হাঁক ছাড়ল। এবার ভেতরকার লুঙ্গি পড়া মানুষটা একটু জোড়েই জবাব দিলো, ' না, কিছু হবেনা এই সকালে!'
অভীক ঘড়িতে দেখলো, ১০টা বাজে। মনে মনে ভাবলো, এই নাকি সকাল? তাতে আবার খাবার নেই! একটু বিরক্তি আর হতাশা বেরিয়ে এলো, ' একটা বোর্ড লাগিয়ে রাখতে পারে তো!' কুশল হালকা সুরে বললো, ' সারা রাত এরা ডিউটি করে তো, একদম ভোর অবধি। তাই এই সময়টা খাবার থাকে না বোধহয়। এখন ওতো গাড়িও নেই। ডিম টোস্ট খাবে নাকি?'
অভীক বললো, ' না, আর কোনো ধাবা নেই এদিকে ভালো?' কুশল সাথে সাথেই বললো, ' হ্যাঁ, আছে তো। অনেক আছে। সামনেই বনফুল।'
গাড়ি ৫ মিনিটে পৌঁছে গেল বনফুল ধাবায়। অভীক ঢুকেই কর্মচারীকে জিজ্ঞেস করলো, খাবার পাওয়া যাবে? হ্যাঁ, যাবে তো। রুটি আছে, ডাল ফ্রাই হবে, আলুর পরোটা, সাথে কাবুলি ছোলা। মনটা চট করে আলুর পরোটার দিকে গেলেও, অভীক বললো, সে রুটি আর ডালই খাবে। সাথে চা। কুশলেরও একই ব্রেকফাস্ট ঠিক হলো। কুশল একটু এদিক ওদিক ঘুরছিল; অভীক ওকে ওর সামনেই বসতে বললো।
তিনটে রুটি আর ছোলার ডাল চলে এলো দু'প্লেট। দেশের গরম পরিস্থিতির আলোচনার মাখন লাগিয়ে গরম রুটি আরও কিছুটা সুস্বাদু হয়ে উঠলো। অভীক একটু পছন্দ করে মানুষের চিন্তাধারা বুঝতে। যদিও, ইদানিং দেশের মানুষের মস্তিষ্কে যেন ভয় আর অবিশ্বাস ছাড়া অন্য কিছুর কোনো জায়গা নেই। কুশলও তেমন ব্যতিক্রম নয়। ফোন, টিভি, খবরের কাগজের মাধ্যমে হানাহানির চর্চা মানুষকে সৈন্য বানিয়ে তুলছে। অভীক হ্যাঁ-তে হ্যাঁ মিলিয়ে চলে; কাউকে কিছু শেখানোর, বোঝানোর ইচ্ছে হয়না তার। তার মনে হয়, মানুষ ভালো হতেই চায়; সাময়িক ভাবে উত্তেজিত হওয়া এক প্রকার নিজেকে নিজের অস্তিত্ব জানানো - যেমন যেকোনো ডেসার্টে অল্প নুন তার স্বাদ বাড়িয়ে দেয়।
খাওয়া শেষ হলে, বিল মিটিয়ে অভীক গাড়িতে গিয়ে বসলো। এবার বাড়ি ফেরার পালা। সুন্দর ভাবে গাড়ি চলতে থাকলো গঙ্গারামপুরের পথে। এটা - ওটা আলোচনা চলছে দুজনের। অভীক শুনছে, মাথা নাড়ছে; কুশল অনেক কিছু বলছে, আনন্দে আছে। বুনিয়াদপুর পেরিয়ে একটু এগোতেই কুশল গাড়ি থামিয়ে দিলো। অভীক একটু অবাক হয়ে বললো, কি হলো?
- এমন একটা জিনিস দেখলাম, দু'বার না দেখে পারছি না। এই বলে কুশল হাইওয়েতেই গাড়ি ঘুরিয়ে ৫০ মিটার পেছনে গেলো। আবার গাড়ি ঘুরিয়ে আগের রাস্তায় নিয়ে এলো।
কি দেখলেটা কি তুমি? অভীকের মনের মধ্যে তখন পুলিশ পুলিশ গন্ধ আসছে।
- ঐযে সামনে সাদা এম্বাসেডরটা দেখছো, ওটা আমার প্রথম গাড়ি। ১৩ বছর আগে বিক্রি করেছিলাম। রাস্তায় দেখেই মনে হয়েছিল, কিন্তু তাও একবার শিওর হওয়ার জন্য ঘুরলাম।
কুশলের এই ভাব দেখে যেন কোন্ অদৃশ্য অজানায় হারিয়ে গেলো অভীক। তার নিজের কোনো গাড়ি নেই, কিন্তু সে জানে মানুষের নিজের চালানো বা কেনা গাড়ির সাথে বন্ধন থাকে একটা। সেটা কতটা গভীর তা আজ কুশলের এই মুহুর্তের উত্তেজনা অভীককে বুঝিয়ে দিচ্ছে যেন। শুধু গাড়ি কেন? এ যেন এক মহাজাগতিক মিল - যা সবাই কিছু না কিছু নিয়ে অনুভব করে কখনো বা কখনো। পুনর্ভবা নদীর ব্রিজের ওপর এম্বাসেডরটা দাঁড়ালো। কুশলও গাড়িটা থামিয়ে অভীককে বললো, যাই একবার কথা বলে আসি?
অভীক আবারও হেসে মাথা নেড়ে সায় দিলো।